"> ‘রেখেছ বাঙ্গালি করে-মানুষ কর নি’ ‘রেখেছ বাঙ্গালি করে-মানুষ কর নি’ – Dailyajkersangbad

মঙ্গলবার, ১৪ Jul ২০২০, ০৩:০৭ অপরাহ্ন

‘রেখেছ বাঙ্গালি করে-মানুষ কর নি’

‘রেখেছ বাঙ্গালি করে-মানুষ কর নি’

কবিগুরূ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বঙ্গমাতা’ কবিতায় লিখেছেন- “সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী রেখেছ বাঙ্গালি করে – মানুষ কর নি।”  উপরের রবি পংতি হতে সহজে বুঝে নেওয়া যায়, সকল বাঙালি দ্বিপদ বিশিষ্ট দেহধারী মানুষ হয়েও যোগ্য মানুষ হয়ে উঠেনি। অর্থাৎ সকল বাঙালিই মানুষ নামধারী ক্কিন্তু সকল বাঙালি যোগ্য মানুষ নয়। এ দায় কবিগুরু চাপিয়েছেন জননীর উপর! অনুচ্চারিত রয়েছে পিতার কথা! যেন পিতাকে দিয়েছেন দায়মুক্তি! বাংলাদেশ দায়মুক্তির দেশ হয়ে উঠেছে সেই ১৯৭৫ সাল থেকে।

তখন বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীরা পেয়েছিল দায়মুক্তি! সেই চলমানতা থেমে নেই। ‘ক্লিনহার্ট ছিল ক্লিন অপারেশন ট্যু কিল। তারপর অপারেটরদের দেয়া হয়েছিল ‘দায়মুক্তি’। দায়মুক্তি কথাটা শুনতে দারুন। পাঠক দায়মুক্তি আমি, আপনি চাই। তবে ইহকালে নয় পরকালে। পরকালে এহেন দায়মুক্তি্র যদি থাকত নিশ্চয়তা তবে আমরা কি না করতাম? পরকালে দায়মুক্তি নেই তারপরও আমরা ধরাকে শরা জ্ঞান করতে কম কছুর করি না! হতাশ হবেন না। পরকালেও আছে দায়মুক্তি। বলবেন কি করে? আমরা পাপী বান্দা। অনন্তর পাপ করে চলেছি। ক’জন আছেন যারা বলতে পারেন তিনি পাপের উর্দ্ধে? সৃষ্টিকর্তা ক্ষমাশীল। আমরা মহান সৃষ্টিকর্তার অসীম ক্ষমার মধ্যে বাস করি। বিদ্রোহী কবি কাজী ’পিতৃতান্ত্রিকতা কি রবীন্দ্রনাথের উপর প্রভাব ফেলেছিল? রবীন্দ্র-সমালোচক, গবেষকরা এ বিষয়ে কি বলবেন?

আসলে মা, মাটি, ধরিত্রী একসূত্রে বাঁধা, তারা সর্বংসহা হয়ে বিরাজ করে। জননী বিমুগ্ধ বলেই মানব সন্তানের শত অত্যাচার নীরবে সহ্য করে চলেন। চেয়ে দেখুন বাংলা মায়ের দিকে। মোগল, পাঠান, শক, হুন, ব্রিটীশ, পাকিস্তান সকলেই এখানে এসেছে বাংলা মায়ের ঐশ্বর্যের আকর্ষন ও লোভে। সকলে লুটে নিয়েছে ভান্ডার। তারপরও ভরা এ ভান্ডার। এ বাংলা ‘সোনার বাংলা’। সোনার খনি এখনও আবিষ্কৃত হয় নি তা হলে কি হয়েছে? এখানে রয়েছে সোনার ছেলে। সোনার মানুষ। বাংলার দামাল সোনার ছেলেরা ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর মুক্তি ও স্বাধীনতা মন্ত্রে দীক্ষা নিয়ে নয় মাস মরনপণ সংগ্রাম করেছে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের নির্দেশনা ছিল আমাদের মুক্তি সংগ্রামের মূলমন্ত্র। আমরা করেছি সংগ্রাম। পাকিস্তানী সেনা বাহিনী করেছে যুদ্ধ। তাদের কাছে অত্যাচার, নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ, লুট, ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া ছিল ‘মদুদী ধর্ম’ অনুশাসনের ধবজাধারী শাসকদের ‘অসত্য আদর্শ’। বাঙ্গালির সত্যের কাছে পরাভূত হয়েছে পাকি-অসত্য। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে ‘ঐতিহাসিক’ সারেন্ডার করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বাপেক্ষ বৃহত্তম পরাজয়ের গ্লানি মাথায় নিয়ে পাকি বাহিনী!  ৯৩ হাজার ৩৬৮ জন আত্মসমর্পনে শামিল হয়। এর মধ্যে ছিল সেনা বাহিনী—৫৪,১৫৪, নৌ—১,৩৮১, বিমান বাহিনী-৮৩৩, প্যারা মিলিটারী-২২,০০০, বেসামরিক ব্যক্তি-১২,০০০ সর্বমোট ৯৩,৩৬৮ জন! হায়রে বাঙালি তুই কি দেখাইলি? “সাবাস বাংলাদেশ, বিশ্ব অবাক তাকিয়ে রয়, জ্বলে পুরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়”।

বাংলা মায়ের সোনার ছেলে, সোনার মানুষ আছে বলেই সোনার বাংলা গড়ার কাজ তরতর করে এগিয়ে চলছে। পরাধীনতা মা’কে বন্দী করে সন্তানদের করে রেখেছিল শৃঙ্খলিত। আর এজন্য মার সাধ্য ছিল না সন্তানকে মানুষ করার। তবে মা সন্তানের বাঙ্গালিত্ব লালন-পালন করে ঠিকই টিকিয়ে রেখেছিল। রেখেছিল বলেই বাংলা মায়ের সন্তানেরা গর্জে উঠে জিন্নাহর দম্ভকে ভেঙ্গে খান খান করে দিয়েছিল। ঘোহণা দিয়ে মাতৃসন্তানেরা জানিয়ে দেয় ‘রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা। বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে ১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে মায়ের ভাষার মর্যাদা। এমন কর্ম আর কোথায় কে দেখেছে? এইতো শুরু। বাংলা মায়ের দামাল ছেলেদের সাহস, বীরত্ব, গুলির মুখে বুক পেতে দেওয়ার নজিরবিহীন ইতিহাস দেখে বাংলা মায়ের আর এক সন্তান গোপালগঞ্জের মধুমতি পাড়ের বিংশ শতাব্দীর ‘হ্যামীলন’ শেখ মুজিব জীবন বাজি রেখে নেমে পড়েন মুক্তি ও স্বাধীনতা সংগ্রামে। তাঁর পণ বাংলা মায়ের সন্তানের বাঙ্গালিত্ব অটুট রেখে মানুষ হিসাবে বিশ্বের দরবারে দেবেন পরিচিতি। অর্থাৎ মায়ের সন্তান একাধারে হবে বাঙালি ও যথার্থ মানুষ।

তাইতো ফাঁসির মঞ্চ মাড়িয়ে জীবনের জয় গান গেয়ে মুক্ত মানব হয়ে মুক্ত বাংলাদেশে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ ফিরে এসে স্বাধীনতা উদ্যান যেখানে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ ঘোষনা দিয়েছিলেন মুক্তির সনদ এক অনবদ্য গদ্য কবিতা সেই অদম্য উদ্যানে বিজয়ীর বেশে হাজির হয়ে বিশ্বকবির উদ্দেশ্যে বলেন, কবি তুমি দেখে যাও তোমার বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে। অর্থাৎ কবির চাওয়া আজ পূর্ণতা পেয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পরাধীন যুগে দেখেছেন বাংলা মায়ের ম্লান মুখ। দেখেছেন বাঙালি বীর সুভাষ বসুর চেষ্টা কিভাবে ব্যর্থ হয়ে গিয়েছে। তিনি দেখেছেন, কেন জন্মদাতা বাংলা মা পারছেন না তার সন্তানকে মানুষ করতে। মর্মে মর্মে অনুভব ও উপলদ্ধি করেছেন সন্তানের জন্য মায়ের তীব্র কষ্ট, বেদনা।

কবি দেখেছেন রাহ্মনবাড়িয়া জেলার সরাইলবাসী ইংলন্ডের ডিগ্রীধারী দ্বিজদাস দত্তের পুত্র, প্রেসিডেন্সী কলেজের ছাত্র অসম সাহসী মুক্তিকামী বিপ্লবী উল্লাসকর দত্তকে যিনি বাঙালি ছাত্রদের গালি দেয়ার অপরাধে প্রেসিডেন্সী কলেজের ইংরেজ শিক্ষক রাসেলকে জুতোপেটা করে কলেজের পাঠ চুকিয়ে চলে এসে বোমা তৈরি করে ১৯০৮ সালে মানিকতলার বাগান বাড়িতে ধৃত হয়ে আন্দামানে নির্বাসিত হয়েছিলেন। দেখেছেন কুমিল্লার ফয়জুন্নেসা স্কুল ছাত্রী পিতা অধ্যাপক দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ এবং মাতা সলিলবালা ঘোষের কন্যা শান্তি ঘোষ, ‘শান্তি সেবক বাহিনী’র ‘মেজর’ সুনীতি চৌধুরীকে কুমিল্লার ডিষ্ট্রিক্ট ম্যাজিষ্ট্রেট —-কে পিস্তল চালিয়ে বাসভবনে এবং তরুন শৈলেশ রায়কে দেখেছেন কুমিল্লার পুলিশ সুপার বেমন্ট এলিসনকে প্রকাশ্য দিবালোকে ১৯৩২ সালে গুলি চালিয়ে হত্যা করতে। তিনি দেখেছেন সূর্য সেনের ফাঁসি, প্রীতিলতার আত্মত্যাগ।

তাই তিনি আশান্বিত হয়ে দেশ মাতার মুক্তি চেয়ে সকল সন্তানের মানুষ হওয়ার রুদ্ধ পথ খুলে দিয়ে প্রশস্ত করার তাগিদ দিয়েছেন। দেশমাতার মুক্তি না আসলে পরাধীনতায় বেড়াজালে আবদ্ধ থেকে বাঙ্গালি সন্তানের যোগ্য মানুষ হওয়া হবে সুদূর পরাহত। প্রবল আক্ষেপ তাড়িত হয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে ‘বঙ্গমাতা’ কবিতাটি রচনা করে সন্তানের মানুষ হওয়ার যে সকল প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তা সরানোর জন্য ঘাঁ মেরে পরাধীনতার অন্ধকার ভেদ করে বেরিয়ে আসার তাগিদ দিয়ে কথাগুলো বলেছেন।

পরাধীনতায় শিক্ষা বঞ্চিত তারুণ্য শক্তি পথ হারিয়ে বিপথগামী হয়ে ক্রমশঃ নির্জীব হয়ে পড়ে। থাকে না স্বপ্নের বাস্তবায়ন। নেতৃত্বও লেজুড় বৃত্তির সুবিধাভোগী পার্টনার হয়ে জনগণ তথা দেশ মাতৃকার বিরুদ্ধাচারণে হয় রত। এমনটি আমরা দেখেছি পাকি শাসনামলে। মুসলিম লীগ, জামাতে ইসলামি হয়ে পড়ে ইসলামাবাদের ইসলাম পন্থী পাকি-সরকারের ‘বি’ টিম। বঙ্গবন্ধু দেশ মাতৃকার করুন আর্তনাদ, তরুন প্রজন্মের অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবিষ্যত হৃদয়াঙ্গম করে বীরের বেশে অবতীর্ণ হন রাজনৈতিক ক্রুসেডে। তার একমাত্র ধ্যান, জ্ঞান ছিল বঙ্গমাতার মুক্তি ও স্বাধীনতা। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ‘সোনার তরী’ কূলে ভিড়িয়ে বিশ্ব কবিকে নবজন্ম নিয়ে আবির্ভূত হতে আহবান জানিয়েছেন বাংলা মায়ের ‘সোনার বাংলা’য়। কবি চেয়েছিলেন তারুণ্য শক্তির সত্যিকার উদ্বোধন। ৭১ এ তারুণ্য শক্তি জেগে উঠে স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে এনে বাংলা মাকে মুক্ত করে প্রমাণ করেছে তারা মানুষ হয়েছে। কেউ তাদের আর দাবায়ে রাখতে পারবে না। পরাধীনতা মুক্ত হয়ে ১৬ কোটি বাঙ্গালির মুগ্ধ জননীর মুঝে হাসি ফুটেছে। কালো অধ্যায়ের ঘটেছে যবনিকাপাত। বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে আজ মাথা তুলে এক অমিত সম্ভবনার দেশে পরিগণিত হয়েছে।

মহান বিজয়ের মাসে আসুন আমরা স্মরণ করি সকল শহীদ বীর মুক্তিসংগ্রামীদের যাঁদের চরম ত্যাগে দেশ হয়েছে স্বাধীন। আমরা লাভ করেছি স্বাধীনতা। ডিসেম্বর পাকিস্তানের সারেন্ডারের মাস। উল্লেখ্য ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে ১৬ ডিসেম্বরে পাকিস্তানীদের সারেন্ডার দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর বিশ্বে সর্বাপেক্ষা বৃহত্তম সারেন্ডার। এই দিনে বঙ্গবন্ধুর, বাঙ্গালির ‘জয় বাংলা’র জয় হয়েছে প্রতিষ্ঠিত। এই প্রাপ্তি বাঙালি জাতিকে দিয়েছে মহান বিজয়ের গৌরব। আসুন আমরা জাতির পিতাকে স্মরণ করে বাংলা মায়ের বিজয়ে সমস্বরে গাই,—-     ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি  তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী!  ওগো মা, তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে!   তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে॥‘

 

 

লেখকঃ সাবেক এ আই জি, বাংলাদেশ পুলিশরম্য লেখক ও প্রাবন্ধিক

 

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com