শুক্রবার, ৩০ জুলাই ২০২১, ০৪:৩১ অপরাহ্ন

একজন সাধারণ গৃহিণীর সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক :
  • প্রকাশিত সময় : শনিবার, ৩ জুলাই, ২০২১
  • ৬২৬ পাঠক পড়েছে

যতই দিন যাচ্ছে ততই মানুষ পৃথিবীটাকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসছে।বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের প্রিয় দেশ বাংলাদেশও ডিজিটাল হচ্ছে। মোবাইলের বাটন চেপে বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন ধরনের খবরাখবর নেয়া যায়। ডিজিটালাইজেশনের এই যুগে ঘরে বসে অনলাইনে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা করে যাচ্ছেন দেশি-বিদেশী লাখো-কোটি বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ। অনলাইনে ব্যবসা করে অনেকেই সাবলম্বি হচ্ছেন, হয়েছেন।

অনলাইনে তাঁত শাড়ির ব্যবসা শুরু করেছেন এবং সাবলম্বিও হতে চলেছেন তেমনই একজনার গল্প আজ পাঠকদের জানাবো। জানাবো তার কংঙ্কাবতী অনলাইন সাইটটি কিভাবে তাঁত শাড়ির ব্যবসা শুরু করলো। পাশাপাশি দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশে অর্থাৎ অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ও সুইডেনে অনলাইনে শাড়ির ব্যবসা করে এই উদ্যোক্তা বর্তমানে কি অবস্থায় আছেন। এবং তার ব্যবসা নিয়ে নানা অভিজ্ঞতার কথা পাঠকদের উদ্দেশ্যে তিনি তুলে ধরেছেন।

কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ। জী হ্যা আসলেই তাই। কথাটা শুনতে হয়তো খারাপ লাগবে তবুও আমার জীবনে এই লকডাউন পৌষ মাস হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছে। শুধু আমার না আমার মতো আরো অনেক ছোট ছোট উদ্যোক্তার জন্ম দিয়েছে এই লকডাউন।আমি প্রজ্ঞাপারমিতা, ওনার অব কংঙ্কাবতী। আমি ঢাকার সরকারী তিতুমির কলেজ থেকে অনার্স, মাস্টার্স সম্পন্ন করে হাউজ ওয়াইফ হয়ে বসে ছিলাম। আসলে বসেছিলাম এজন্য বলছি কেননা আমাদের সমাজে হাউজ ওয়াইফদের খুব ছোট চোঁখে দেখা হয়। মনে করা হয় হাউজ ওয়াইফ মানেই শুয়ে বসে আরামে দিন পার করা। অথচ একজন হাউজ ওয়াইফ যে একটি পরিবারের মেরুদন্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে তার নূন্যতম মর্যাদাও তাদের দেয়া হয় না।

যাই হোক পড়াশুনা করে যখন চাকরি না করে সংসার আর বাচ্চাদের কথা চিন্তা করে গৃহিণী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম, আশপাশের অনেকের অনেক কথার সম্মুখিন হতে হয়েছে আমাকে। আমার নিজের জন্য যতোটা না আফসোস ছিলো আমার আশপাশের মানুষদের তার চেয়ে বেশি আফসোস ছিলো। আর যখন যথেষ্ট নামকরা একটি প্রতিষ্ঠানে স্মার্ট স্যালারি পেয়েও জয়েন্ট না করে মাতৃত্বকে অধিক মূল্যায়ন করলাম তখন যেন সবার কাছে অনেকটাই অবিশ্বাষ্য এবং হাস্যকর বিষয়ে পরিনত হয়ে উঠলাম। তবুও সবার শত কথা আর উপহাস মুখ বুজে সহ্য করে আমি আমার মতো করে ভালো থাকার চেষ্টা করতাম। ঠিক এক বছর আগে প্রথম যখন করোনার ভয়াবহতায় সারা পৃথিবী অচল হয়ে পড়ল, লকডাউনে বন্দী হয়ে পড়ল অনেক মানুষ তখন কেন জানি আমার মাঝে থেকে আমার আমিটা বেড়িয়ে এলো।

সবার বন্দী জীবন থমকে গেলেও নিত্য প্রয়োজনীয় চাহিদা গুলোতো থেমে গেল না বরং চাহিদা গুলো যেন আরো প্রকট ভাবে দেখা দিতে লাগল। তখন সবার চাহিদা পূরণের প্রধান উপায় হিসেবে অনলাইনে কেনাকাটার জনপ্রিয়তা বেড়ে গেল। আমি নিজেও প্রায় সব কিছুই অনলাইনেই কেনাকাটা করতাম। ওই সময় আমি উই গ্রুপে যুক্ত ছিলাম। সেখানে রোজ অনেক নারীর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প পড়তাম। তখন হঠাৎ মনে হলো আমি নিজেওতো এমন উদ্যেক্তা হয়ে উঠতে পারি। সফলতা-বিফলতা যাই হোক চেষ্টা তো অন্তত করতেই পারি। যখন আমি আমার এই চিন্তার কথা আমার হাজবেন্ডের সাথে আলোচনা করলাম সেতো আমার চাইতে আরো বেশি আগ্রহী হয়ে উঠলো। আসলে ও সবসময় চাইতো যেন আমি নিজে কিছু একটিা করি। এরপর ভাবতে লাগলাম কি নিয়ে কাজ করা যায়। আমরা দুজন আবার যেকোন কাজ করার আগে দুজন বসে আলোচনা করে তারপর সিদ্ধান্ত নেই। সেটা যে বিষয়ই হোক আর যার বিষয়েই হোক। আমরা একে অপরের সাথে আলোচানা না করে কোন কাজ করতাম না। তো তার সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলাম আমি অনলাইনে বিজনেস করবো। কিন্তু সমস্য হচ্ছে কি নিয়ে করব বুঝতে পারছিলাম না। তখন সেই আমাকে প্রথম মনে করিয়ে দেয় যে আমি শাড়ি নিয়ে কাজ করতে পারি। কেননা শাড়ি আমার সবচেয়ে প্রিয় জিনিসগুলোর একটি। শাড়ি পরা আর কেনা আমার অন্যতম শখ। তবে জমকালো দামি দামি শাড়ি আমার তেমন পছন্দের না। আমার পছন্দ দেশী তাঁতের সুতী শাড়ি। এমনো হয়েছে আমি মাসে ২/৩টি শাড়ি কিনে ফেলতাম। তাই আমার হাজবেন্ডের পরামর্শ আমরা খুব পছন্দ হলো। এরপর খোঁজ নিতে শুরু করলাম কোথায় এই শাড়ি পাওয়া যেতে পারে।

বিভিন্ন অনলাইনে সার্চ করে আর পরিচিত কয়েকজনের মাধ্যমে জানতে পারলাম বিভিন্ন শাড়ির হাট আছে; যেখানে স্বল্প মূ্ল্যে শাড়ি পাওয়া যায়। আর সবাই এখান থেকেই শাড়ি সংগ্রহ করে ব্যবসা করে। তো যেই ভাবা সেই কাজ। ছুটে গেলাম হাটের উদ্দেশ্যে কিন্তু যে আশা নিয়ে ছুটে গেলাম প্রথমেই ব্যর্থ হলাম। করোনা আর বিরুপ আবহাওয়ার জন্য হাটের অবস্থা ছিল খুবই খারাপ। কোন ভালো মানের শাড়িই খুঁজে পেলাম না।

পরবর্তী সময়ে কবে হাট বসবে তা শুনে ফিরে এলাম। এরপর আবার হাজির হলাম হাটে। ছোট দুই বাচ্চা (আমার সন্তান) নিয়ে ভোরবেলাই পৌছে গেলাম হাটে। কিন্তু এতোটা হতাশ হতে হবে কল্পনাতেও আসেনি। যে ধরনের শাড়ি দিয়ে হাট ভর্তি আমি নেজের জন্যই তা কখনো কিনবো না। তাহলে বিজনেস করবো কিভাবে? মনে মনে হতাশ হয়ে যাচ্ছিলাম। তখন আমার হাজবেন্ড খোঁজ নিতে শুরু করলো আশেপাশের অন্য কোথায় ভালোমানের শাড়ি পাওয়া যেতে পারে। তখন হাটে এক তাঁতির সাথে পরিচয় হয় আমাদের। তার সাথে অনেক ভিতরে তাদের গ্রামে ছুটে গেলাম। তার সংগ্রহের কিছু শাড়ি পছন্দ হয়ে গেল। যদিও আমার প্রথম পছন্দ যে ধরনের শাড়ি সেই ধরনের শাড়ির সাথে এগুলোর তেমন মিল নেই। তবও প্রাথমিকভাবে শুরু করার জন্য কিছু শাড়ি নিয়ে এলাম। খুবই হতাশা কাজ করছিলো মনের মাঝে । পরে সেই তাতি আমাদের আমন্ত্রণ জানান তার কারখানায়। আবার ছুটে যাই সেখানে। সেখানে গিয়ে আরো হতাশ হই। কেননা খুব করুন অবস্থা তাদের। করোনা আর বন্যা এই দুই ভয়াবহ দূর্যোগ তাদের নি:স্ব করে দিয়েছে। সব তাঁত বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। তখন তারা প্রস্তাব দেয় যে আমি যদি তাদের কাজ দেই তবে তারা আমার পছন্দ অনুযায়ী কাজ করে দিবে। তাদের কিছু সংগ্রহ আমাকে দেখানোর পর আমার সেগুলো পছন্দ হয়ে যায়।

কিন্তু যেহেতু আমি নতুন, তাই এতোবড়ো রিস্ক নিবো কি-না বুঝতে পারছিলাম না। তখন নিজের মনকে সাহস জুগিয়ে রাজি হয়ে যাই। তাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে কিছু কাজ বুঝিয়ে অগ্রিম মূল্য পরিশোধ করে ফিরে এলাম। তারপর  শুরু করলাম পরবর্তী ধাপ। পেইজ খুলতে হবে। কিন্তু এই বিষয়ে আমার তেমন কোন ধারনা নেই। আবাবো আমার হাজবেন্ড এগিয়ে এলো। তার সাহায্যে তার পরিচিত একজনের মাধ্যমে পেইজ ওপেন করলাম। নাম রাখলাম কংঙ্কাবতী। এবার পেইজে শাড়ি পোষ্ট করার পালা। বিভিন্ন পেইজ ঘুরে শাড়ির ছবি তোলার ধারনা নিলাম। আগে ভাবতাম খুবই সহজ একটি বিষয়। এতো যে কঠিন শাড়ির ছবি তোলা তা ধারনাও ছিলো না। যেমন তেমন ছবি তুলে পোস্ট করা শুরু করলাম। কিন্তু শুরুতেই তো আর বিক্রি হবে না। ধৈর্য্য ধরতে হবে আমাকে। এই সময় আমি উই গ্রুপে প্রচুর সময় দিতাম। প্রচুর লিখতাম, শাড়ির ছবি দিতাম। অল্প সময়েই বেশ পরিচিতি পেয়ে গেলাম। বেশ কিছু অর্ডার পেতে শুরু করলাম। পরিবার আর আত্মিয়-স্বজনও যথেষ্ট সাপোর্ট দিয়েছে। আমার প্রথম কাষ্টোমার ছিলো আমার নিজের বোন। সে এক সাথে ৮টি শাড়ি নিয়েছিলো। আমার প্রথম নিজের বিজনেস এর টাকা ছিলো তার কাছে থেকে পাওয়া। কি যে আনন্দের মুহূর্ত ছিলো সেটি বলে বোঝানো যাবে না।

আর দ্বিতীয় কাষ্টোমার ছিলো উই গ্রুপের একটা আপু। নীলফামারি থেকে আপু আমার শাড়ি অর্ডার করেছিলেন। সেটাও অন্যরকম এক ভালো লাগার মতো বিষয় ছিলো। এরপর দুইটা হলুদের অনুষ্ঠানের অর্ডার পাই। আলহামদুলিল্লাহ্ এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি আমাকে এখন এই এক বছরে আমার অনেক লাভ না হলেও কখনো লস এর খাতায় অমার নাম লিখতে হয়নি। এখন প্রায় প্রতিদিনই ৫/৬টি শাড়ির অর্ডার থাকে। এছাড়াও গত রোজার ঈদে, ঈদের আগের দিন পর্যন্ত আমার ডেলিভারি দিতে হয়েছে। আর এখন তো সামনেই কোরবানীর ঈদ। ঈদের কেনাকাটাও শুরু হয়ে গেছে। অনেক ব্যস্ত সময় পার করছি আমরা। রোজ প্রায় ১০/১২টি পর্যন্ত শাড়ির অর্ডার নিশ্চিত হচ্ছে। এখন আর হতাশা কাজ করেনা, এখন নিজের জন্য অন্য রকম এক ভালোলাগা কাজ করে। এখন মনে হয় নিজের একটা পরিচয় আছে। হয়তো খুব ছোট্ট একটা পরিচয় তবুও নিজের চেষ্টায় আর নিজের পরিশ্রমের তৈরী এই ছোট্ট কংঙ্কাবতী আমার অহংকার। কংঙ্কাবতী, ১২৯ নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১২১৭, মোবাইল-  ০১৭১১৪২৭৩৭৩, ইমেইল: [email protected]

নিউজটি শেয়ার করে আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর
© All rights reserved © 2019-2020 । দৈনিক আজকের সংবাদ
Design and Developed by ThemesBazar.Com
SheraWeb.Com_2580