বুধবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২১, ০৬:৫১ অপরাহ্ন

আবারও কঠোর লকডাউনে দেশ

নিউজ ডেক্স:
  • প্রকাশিত সময় : শুক্রবার, ২৩ জুলাই, ২০২১
  • ৪১ পাঠক পড়েছে

ঈদুল আজহার ছুটি শেষে শুক্রবার ভোর থেকে সারাদেশে ফের কঠোর লকডাউন শুরু হয়েছে। এই কঠোর লকডাউন বলবৎ থাকবে আগামী ৫ আগস্ট রাত ১২টা পর্যন্ত।

করোনা সংক্রমণের উল্লম্ফন ঠেকাতে দুই সপ্তাহের এই কঠোর লকডাউন বাস্তবায়নে সরকার এবার ‘কঠোর’ অবস্থানে থাকবে। পুলিশ ও বিজিবি সদস্যদের পাশাপাশি মাঠে নেমেছে সেনাবাহিনী।

এবারের কঠোর লকডাউনে সরকারি, আধাসরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রয়েছে। বন্ধ রয়েছে কলকারখানা ও রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস শিল্প। গতবারের মতোই বন্ধ রয়েছে সব ধরণের গণপরিবহন।

জরুরি প্রয়োজন ব্যতিত ঘরের বাইরে বের হলেই গুণতে হবে জরিমানা, যেতে হতে পারে জেলে।

করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যুর উচ্চ হারের কমিয়ে আনার পাশাপাশি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ কমাতে সরকার গত ১ জুলাই দুই সপ্তাহের জন্য কঠোর লকডাউন ঘোষণা করেছিল। ঈদুল আজহা উপলক্ষে নয় দিনের জন্য তুলে নেওয়া হয় কঠোর লকডাউন।

ঈদুল আজহার পর বিধিনিষেধ শিথিলের সময়সীমা যে আর বাড়ছে না তা বৃহস্পতিবার দুপুরেই নিশ্চিত করেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন।

তিনি সমকালকে বলেন, ‘কঠোর লকডাউন বলতে এবার অফিস আদালত, গার্মেন্টস, রপ্তানি সব বন্ধ থাকবে। আগের মতো মানুষের প্রয়োজন হবে না বাইরে যাওয়ার। এবারের লকডাউন গতবারের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কঠিন হবে। মাঠে পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি ও সেনা সদস্য থাকবে।’

কঠোর লকডাউন ঘোষণার পর গ্রাম থেকে নগরমুখী মানুষের ঢল নামে। বৃহস্পতিবার দুপুর হতে মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া, মাদারীপুরের বাংলাবাজার, পাবনার কাজিরহাট, মানিকগঞ্জের আরিচা ও পাটুরিয়া ঘাটে মানুষের ভিড় উপচে পড়ে। সংক্রমণের তোয়াক্কা না করে ফেরিতে গাদাগাদি করে পদ্মা পাড়ি দিয়ে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করেন তারা।

ঈদযাত্রায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে যাতায়াতে সরকারি নির্দেশনা যখন একেবারেই মানা হচ্ছে না, তখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি কমিটির সদস্যরা বলেছেন, ঈদুল আজহার পর সংক্রমণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। সংক্রমণ বেড়ে গেলে দেশের হাসপাতালগুলো রোগী ভর্তি, সেবাদানের সক্ষমতা হারাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

সেই আশঙ্কার কথা আসতেই জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘ঈদ উদযাপনে যারা গ্রামের বাড়িতে যারা গিয়েছেন, তারা জানেন যে, সব বন্ধ থাকছে। তাদের কর্মক্ষেত্রও বন্ধ থাকছে। তারা সময় নিয়েই গেছেন। আমি বলব, তারা যেন পাঁচ তারিখের (৫ আগস্ট) পরই আসেন। এখন তাদের আসার প্রয়োজন নেই।’

সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এবারের লকডাউনের গুরুত্ব তুলে ধরে ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘এই ১৪টা দিন খুব গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে আমাদের আহ্বান থাকবে, মানুষকে ঘরে থাকতে হবে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে আসা যাবে না। ঘরের বাইরে এলে অবশ্যই ডাবল মাস্ক পববেন। যদি এটা করতে পারি ১৪ দিনের জন্য, তাহলে আমরা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারব। না হলে তা বাড়তে থাকবে। হাসপাতালে রোগীর চাপ কমাতে আমাদের অসুবিধা হবে।’

গত বছরের মার্চে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস হানা দেওয়ার পর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে সব অফিস-আদালত, গণপরিবহন বন্ধ করে এক মাসের জন্য ঘোষণা করা হয় সাধারণ ছুটি। পরে দেশের খেটে খাওয়া মানুষের রুটিরুজি তথা অর্থনৈতিক মন্দার কথার চিন্তা করে শিথিল করা হয় বিধিনিষেধ। এরপর কখনও পূর্ণাঙ্গ, কখনও আংশিক লকডাউন আরোপ করে সংক্রমণ কমানোর চেষ্টা করে সরকার। সংক্রমণ ঠেকাতে মাস্ক পড়া বাধ্যতামূলক করা হয়।

কিন্তু দেশের মানুষ সে লকডাউন ও স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে মাস্কবিহীন অবস্থায় ঘুরে বেড়ায় এখানে-সেখানে। লকডাউনে মূল সড়কে খুব একটা বের না হলেও পাড়া-মহল্লায় আড্ডাবাজি থেমে নেই। সংক্রমণের ভয়কে তোয়াক্কা না করে বিয়ে, জন্মদিনের অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সভাসমাবেশ চলছে হরদম।

এমন পরিস্থিতিতে দেশে হানা দেয় ভারতের অতি সংক্রামক ডেল্টা ভেরিয়েন্ট। গত এপ্রিল মাস থেকে রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে, প্রতিদিন গড়ে দেড় শতাধিক মানুষের মৃত্যুর খবর আসতে শুরু করে। তবে পুরনো সব রেকর্ড ভেঙে গত জুলাই থেকে পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটে। সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যায় পুরনো সব রেকর্ড ভেঙে মৃত্যু সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় দুইশর কোটা। গড়ে ১১ হাজার সংক্রমণের খবর জানাচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

সংক্রমণ ঠেকাতে সরকারের কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান জানান স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের পরামর্শ মোতাবেক আরোপ করা হয়েছে এই কঠোর লকডাউন।

কঠোর লকডাউনে দেশে কোন কোন কার্যক্রম চলবে, কোনটি চলবে না- সেসব জানিয়ে ইতোমধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।

এ প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, অতি জরুরি প্রয়োজন যেমন-ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয়, চিকিৎসা সেবা, মৃতদেহ দাফন বা সৎকারের কাজ ব্যতিত কোনোভাবেই বাড়ির বাইরে বের হওয়া যাবে না। নির্দেশনা অমান্যকারীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কঠোর লকডাউনে যা কিছু বন্ধ থাকবে

# ঈদের পর ২৩ জুলাই থেকে সব সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিসসমূহ বন্ধ থাকবে।

# সড়ক, রেল ও নৌ-পথে গণপরিবহণ (অভ্যন্তরীণ বিমানসহ) ও সব যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে।

# শপিংমল/মার্কেটসহ সব দোকানপাট বন্ধ থাকবে।

# সব পর্যটনকেন্দ্র, রিসোর্ট, কমিউনিটি সেন্টার ও বিনোদনকেন্দ্র বন্ধ থাকবে।

# সব শিল্প-কলকারখানা বন্ধ থাকবে।

# জনসমাবেশ হয় এ ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠান (বিবাহোত্তর অনুষ্ঠান, ওয়ালিমা), জন্মদিন, পিকনিক, পার্টি ইত্যাদি বন্ধ থাকবে।

যা কিছু থাকবে চলমান

# কাঁচাবাজার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে।

# কঠোর লকডাউনে ব্যাংকিং কার্যক্রম নিয়ে গত ১৩ জুলাই এক প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। লকডাউন চলাকালে ব্যাংকগুলোতে লেনদেন হবে সকাল ১০টা থেকে বেলা দেড়টা পর্যন্ত।

# আইনশৃঙ্খলা এবং জরুরি পরিসেবা, যেমন-কৃষি পণ্য ও উপকরণ (সার, বীজ, কীটনাশক, কৃষি যন্ত্রপাতি ইত্যাদি), খাদ্যশস্য ও খাদ্যদ্রব্য পরিবহণ/বিক্রয়, ত্রাণ বিতরণ, স্বাস্থ্য সেবা, কোডিড-১৯ টিকা প্রদান, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) প্রদান কার্যক্রম, রাজস্ব আদায় সম্পর্কিত কার্যাবলি, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস/জ্বালানি, ফায়ার সার্ভিস, টেলিফোন ও ইন্টারনেট (সরকারি-বেসরকারি), গণমাধ্যম (প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া), বেসরকারি নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ভাক সেবা, ব্যাংক, ভিসা সংক্রান্ত কার্যক্রম, সিটি কর্পোরেশন/পৌরসভা (পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সড়কের বাতি ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি কার্যক্রম), সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ফার্মেসি ও ফার্মাসিউটিক্যালসসহ অন্যান্য জরুরি/অত্যাবশাকীয় পণ্য ও সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অফিসসমূহের কর্মচারী ও যানবাহন প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়পত্র প্রদর্শন সাপেক্ষে যাতায়াত করতে পারবে।

# সরকারি কর্মচারীরা নিজ নিজ কর্মস্থলে অবস্থান করবেন এবং দাপ্তরিক কাজসমূহ ভার্চুয়ালি (ই-নথি, ই-টেন্ডারিং, ই-মেইল, এসএমএস, হোয়াটসঅ্যাপসহ অন্যান্য মাধ্যম) সম্পন্ন করবেন।

# জরুরি পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত ট্রাক/লরি/কাভার্ডভ্যান/নৌযান/পণ্যবাহী রেল/ফেরি এ নিষেধাজ্ঞার আওতাবহির্ভূত থাকবে।

# বন্দরসমূহ (বিমান, সমুদ্র, নৌ ও স্থল) এবং তৎসংশ্লিষ্ট অফিসসমূহ এ নিষেধাজ্ঞার আওতাবহির্ভূত থাকবে।

# টিকা কার্ড প্রদর্শন সাপেক্ষে টিকা গ্রহণের জন্য যাতায়াত করা যাবে।

# খাবারের দোকান, হোটেল-রেস্তোরাঁ সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খাবার বিক্রয় (অনলাইন টেকঅ্যাওয়ে) করতে পারবে।

# আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু থাকবে এবং বিদেশগামী যাত্রীরা তাদের আন্তর্জাতিক ভ্রমণের টিকেট/প্রমাণ প্রদর্শন করে গাড়ি ব্যবহার করে যাতায়াত করতে পারবেন। তাদের চলাচলের জন্য বিমান বাংলাদেশ, ইউএস বাংলা ও নভোএয়ারকে অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি দিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ-বেবিচক।

লকডাউন বাস্তবায়নে নির্দেশনা

# আর্মি ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ বিধানের আওতায় মাঠ পর্যায়ে কার্যকর টহল নিশ্চিত করার জন্য সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ প্রয়োজনীয় সংখ্যক সেনা মোতায়েন করবে।

# জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জেলা পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে সমন্বয় সভা করে সেনাবাহিনী, বিজিবি/কোস্টগার্ড, পুলিশ, র‍্যাব ও আনসার নিয়োগ ও টহলের অধিক্ষেত্র, পদ্ধতি ও সময় নির্ধারণ করবেন। সে সঙ্গে স্থানীয়ভাবে বিশেষ কোনো কার্যক্রমের প্রয়োজন হলে সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিবেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগসমূহ এ বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করবে।

# জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় মাঠ পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করবে।

#সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮-এর আওতায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীকে আইনানুগ কার্যক্রম গ্রহণের প্রয়োজনীয় ক্ষমতা প্রদান করবেন।

সংক্রমণ কমিয়ে আনতে সরকার দেশে টিকাদান কর্মসূচি বিস্তৃত করেছে। ৪০ বছরের বয়সসীমা কমিয়ে ৩০ বছর করা হয়েছে। দেশে অ্যাস্ট্রোজেনেকার কোভিড শিল্ড ও ফাইজারের টিকা ফুরিয়ে গেলেও এখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাওয়া মডার্না ও চীন থেকে পাওয়া সিনোফার্ম টিকার পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ৩০ বছর বয়সী নাগরিকদের টিকার জন্য নিবন্ধন করতে অনুরোধ করা হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন এক বুলেটিনে বলেছেন, আমরা চাই দেশের ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকা দিতে। টিকা জোর করে দেওয়ার কোনো ব্যাপার না। কিন্তু টিকাই পারে সংক্রমণের হার কমাতে। টিকা নিয়ে কোনো গুজবে কান না দিয়ে দ্রুত টিকা নিতে হবে। তাতে মৃত্যুর সংখ্যাও কমে আসবে।

করোনাভাইরাস সংক্রমণের পাশাপাশি দেশে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন রোগীরা। কঠোর লকডাউনের আগে তাই করোনার পাশাপাশি ডেঙ্গুবিষয়ক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অনুরোধও এসেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে।

 

 

 

 

 

নিউজটি শেয়ার করে আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর
© All rights reserved © 2019-2020 । দৈনিক আজকের সংবাদ
Design and Developed by ThemesBazar.Com
SheraWeb.Com_2580