রবিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২১, ০৫:৪৪ অপরাহ্ন

কখন থেকে সন্তানকে যৌনশিক্ষা দেওয়া উচিত?

নিউজ ডেক্স:
  • প্রকাশিত সময় : শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
  • ৬৩ পাঠক পড়েছে

নিউজ ডেক্স: একদিন আপনার শিশু সন্তান একজন গর্ভবতী নারীর দিকে আঙুল তুলে বলতে পারে, ‘এই মহিলার পেটে বাচ্চা ঢুকলো কীভাবে?’ এরকম প্রশ্নের জবাবে প্রকৃত কথা গোপন করে মনগড়া কিছু বলাকে আপনি শ্রেয় মনে করতে পারেন, কারণ আপনি হয়তো ভাবছেন যে স্কুলে যাওয়ার পূর্বেই একটা শিশুকে যৌনশিক্ষা দেয়া উচিত নয়। প্রকৃতপক্ষে কিছু গবেষক এমনটা মনে করেন না। তাদের মতে, শিশুকে ডায়াপার পরার বয়স থেকেই যৌনশিক্ষা দেয়া উচিত।

রুটগার্স ইউনিভার্সিটির যৌনশিক্ষা বিষয়ক সংস্থা আনসার’র কার্যনির্বাহী পরিচালক ড্যান রাইস বলেন, ‘শিশু বয়স থেকেই যৌনশিক্ষার সূচনা হওয়া উচিত। বিকাশসাধনের শুরু থেকে শিশুরা সবকিছু বোঝার চেষ্টা করে এবং তাদের শরীর হলো এসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।’

শিশুকে যৌনশিক্ষা দেয়ার মানে কেবল এটা নয় যে, শারীরিক বিকাশসাধন ও বাচ্চা তৈরির প্রক্রিয়া বোঝাবেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, শারীরিক স্পর্শের সীমা সম্পর্কে শিক্ষিত করে তোলা। কারা স্পর্শ করতে পারবে এবং কারা পারবে না তা সম্পর্কে জানাতে হবে।

অনেক অভিভাবক এটা বুঝতে ব্যর্থ হন যে, আত্মীয়স্বজনকে জড়িয়ে ধরা, শিক্ষকের সঙ্গে হাই ফাইভ করা এবং পিতামাতার সুড়সুড়ি সবকিছু শিশুর মনস্তত্ত্বে প্রভাব ফেলে। যৌন স্বাস্থ্য শিক্ষা বিষয়ক গ্রুপ সেক্সুয়ালিটি এডুকেশন ফর অ্যাডভোকেটস ফর ইয়ুথের পরিচালক নোরা জেলপারিন বলেন, ‘শিশুরা শরীরের বিভিন্ন অংশ ও অনুভূতি সম্পর্কে বোঝার চেষ্টা করে।’ তাই বিশেষজ্ঞদের মত হলো, শিশুকালে বয়সানুসারে যৌনশিক্ষা দিতে পারলে আত্মীয়স্বজন বা বাইরের মানুষের দ্বারা নিপীড়নের সম্ভাবনা কমে যাবে। এখানে কোমলমতি শিশুদের যৌনশিক্ষা দেয়ার কিছু কৌশল উল্লেখ করা হলো।

* জীবাণু ছড়াতে নিষেধ করুন
স্কুলে ভর্তির আগে পিতামাতারা শিশুদেরকে ভালো বন্ধুর গুরুত্ব সম্পর্কে জ্ঞান দিতে শুরু করেন। এটা শিশুদেরকে বর্তমানে ও ভবিষ্যতে সুস্থ সম্পর্কে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। কিন্তু কেবল সুন্দর সুন্দর শব্দ ব্যবহারে এরকম উপদেশে সীমাবদ্ধ না থেকে শরীরের বিভিন্ন অংশ সম্পর্কে জ্ঞানদানেরও গুরুত্ব রয়েছে। রাইস বলেন, ‘যখন আপনার শিশুকে কনুইতে কাশি বা হাঁচি দিতে বলেন, তখন তারা রোগপ্রতিরোধের উপায় শিখছে এবং অন্যদের মাঝে জীবাণু ছড়াতে অনুৎসাহিত হচ্ছে। এভাবে শিশুরা সহজেই বুঝতে পারে যে কেউ কাছে আসলে জড়িয়ে ধরা উচিত নয়, এমনকি পরিচিত কোনো মানুষ হলেও। এটা শিশুদের জন্য একটা কৌশলী বার্তা যে নিজের শরীরকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয় এবং কেউ জড়িয়ে ধরতে বা চুমু দিতে চাইলে অনুমতি দেয়া উচিত নয়।’

অধিকাংশ পিতামাতাই শিশুদেরকে যৌনাঙ্গের সঠিক পরিভাষা বলতে অস্বস্তিবোধ করেন, তাই তারা এই অঙ্গের অদ্ভুত পরিভাষা ব্যবহার করেন। উদাহরণস্বরূপ, শিশু আশ্চর্য হয়ে পেনিসের নাম জিজ্ঞেস করলে তাকে বলা হয় যে এটা হলো মানিক! কিন্তু এভাবে ইউফেমিজম (প্রকৃত শব্দের শ্রুতিমধুর পরিভাষা) ব্যবহারের মাধ্যমে শিশুদেরকে এই বার্তা দেয়া হয় যে যৌনাঙ্গের আসল পরিভাষা ব্যবহার করা উচিত নয় এবং শরীরের এসব অংশ নিয়ে লজ্জিত হওয়া উচিত। শিশুদেরকে শরীরের গোপনাঙ্গের মিথ্যে পরিভাষা না বলে সঠিক পরিভাষা জানানো ভালো। সেইসঙ্গে তাদেরকে এটাও বোঝাতে হবে যে এগুলো হলো ব্যক্তিগত অঙ্গ, যেখানে অনুমতি ছাড়া অন্য কারো স্পর্শ করার অধিকার নেই।

ডা. রাইস বলেন, ‘আপনি যেমন নাককে নাক ও কনুইকে কনুই বলেন, তেমনি ভ্যাজাইনাকে ভ্যাজাইনা ও পেনিসকে পেনিস বলা উচিত। আপনার শিশু কথা বলতে পারলেই এসব পরিভাষা শেখাতে পারেন। জেলপারিনের মতে, শেখানোর জন্য ডায়াপার পরিবর্তন ও গোসল করানোর সময়টা উত্তম। অল্প বয়সেই শিশুকে এসব পরিভাষা শেখালে তারা আরেকটু বড় হলে সেখানকার কোনো সমস্যা নিয়ে কথা বলতে লজ্জাবোধ করবে না, যার ফলে সঠিক সময়ে ফলপ্রসূ চিকিৎসা করা সম্ভব হবে।

শিশুদেরকে শারীরিক অংশের সঠিক নাম শেখালে যৌন নিপীড়নও প্রতিরোধ হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, গোপনাঙ্গ সম্পর্কে সঠিক তথ্য শিশু নিরাপত্তার অন্যতম পরিমাপক হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায়ক্ষেত্রে নিপীড়কেরা সেসব শিশুকে টার্গেট করে যারা ভ্যাজাইনা বা পেনিস কি তা জানে না। জেলপারিন বলেন, যেসব শিশু যৌনাঙ্গের সঠিক নাম বলতে পারে না তাদের মধ্যে নিপীড়নের হার বেশি।

জেলপারিন জানান, ‘শিশুকে গোপনাঙ্গের বিশদ বর্ণনা দেয়ার দরকার নেই। কেবল সঠিক নামটা বলুন এবং জানান যে এগুলোও শরীরের অন্যান্য অংশের মতো স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক। এটাও অবহিত করুন যে এসব অঙ্গ নিয়ে প্রশ্ন করাতে লজ্জা বা দ্বিধার কিছু নেই।’

* বিশ্বস্ত মানুষ শনাক্ত করুন
শিশুদের জন্য বিশ্বস্ত বয়স্ক মানুষ শনাক্ত করার গুরুত্বকেও অস্বীকারের উপায় নেই। শিশুদের জীবনে এমনও পরিস্থিতি আসতে পারে যখন পিতামাতার অনুপস্থিতিতে বিশ্বস্ত কারো সাহায্যের প্রয়োজন হতে পারে। প্রথমে পিতামাতাকে বিশ্বস্ত মানুষ শনাক্ত করতে হবে। এক্ষেত্রে বয়সকেও প্রাধান্য দেয়া উচিত, বিশেষ করে এমন কাউকে নির্বাচনের চেষ্টা করুন যার বয়স ৫০ পেরিয়েছে। কেউ শরীরে হাত দিলে, খারাপ কিছু বললে অথবা কঠিন প্রশ্ন থাকলে ওই বিশ্বস্ত মানুষকে জানাতে বলুন। জেলপারিনের মতে, প্রকৃতিগতভাবে শিশুদের মনে কৌতূহল খেলা করে। এই কৌতূহলের একটি অংশ হলো যৌনতা। এই বিষয়টা কেবল পিতামাতা ও শিশুদের মধ্যে সীমিত থাকলে তারা প্রয়োজনের সময় সাহায্য নাও পেতে পারে। শিশুরা পিতামাতার সঙ্গে যেভাবে দ্বিধা ছাড়াই যৌনতা বিষয়ক কথাবার্তা বলেন সেভাবে যেন বিশ্বস্ত মানুষটার সঙ্গেও বলেন। এর ফলে তাদের সঙ্গে খারাপ কিছু ঘটার আশঙ্কা থাকলে কাঙ্ক্ষিত সাহায্য পেতে পারে।

* ছেলেমেয়ের বৈষম্য দূর করুন
লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ও যৌন নিপীড়নের অন্যতম কারণ ছেলেমেয়ের মধ্যে পারিবারিক বৈষম্য। একারণে শৈশব থেকেই সন্তানদের এটা মনস্থ করা গুরুত্বপূর্ণ যে ছেলেমেয়ে সকলেই সমান। কিন্তু পরিবার ছেলেমেয়েদের মধ্যে আদর-সোহাগ বা কিছু বণ্টনে বৈষম্য করলে অবুঝ মনে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়, যা কোনো ঘটনার প্রেক্ষাপটে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে আত্মহত্যা বা সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। এছাড়া পারিবারিক বৈষম্য ছেলে শিশুকে উদ্ধত আচরণে উদ্বুদ্ধ করে। এটা সময় পরিক্রমায় মেয়েদের সঙ্গে খারাপ আচরণে প্রভাবিত করে। অন্যদিকে এই বৈষম্য মেয়ে শিশুকে এটা ভাবতে প্ররোচনা জোগায় যে সে একটা নগণ্য কিছু ও তার সঙ্গে খারাপ কিছু হওয়া স্বাভাবিক। এভাবে সময় পরিক্রমায় নারীরা দুর্বল হিসেবে বেড়ে ওঠে ও তাদের সঙ্গে অন্যায্য কিছু ঘটলেও প্রতিবাদ করার সাহস পায় না। জেলপারিন বলেন, ‘ছেলেমেয়ে উভয়েই সমান আচরণ পাওয়ার অধিকার রয়েছে। আমরা শিশুমনে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে একটা আদর্শ প্রজন্মের আশা করা যায়।’ বৈষম্য দূরীকরণের একটি উদাহরণ হলো- ছেলের রঙ ও মেয়ের রঙ বলতে কিছু নেই, যেকেউ যেকোনো রঙকে পছন্দ করতে পারে, অন্যের পছন্দকে উপহাসের পরিবর্তে সম্মান করতে হয়। খেলনা, পোশাক বা কস্টিউম ও অন্যান্য ক্ষেত্রে এভাবে শিক্ষা দেয়া যায়। এটা শিশুকে ইতিবাচক ভাবনায় উদ্বুদ্ধ করবে।

* আত্মবিশ্বাস, আত্মসম্মান ও আত্মমূল্যায়নের শিক্ষা দিন
ডা. রাইসের মতে, যৌনশিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আত্মসম্মান, আত্মবিশ্বাস ও আত্মমূল্যায়নের শিক্ষা। গভীরভাবে না ভাবলে উভয়ের মধ্যে সম্পর্ক আছে বলে মনে হবে না, কিন্তু একটা শিশুকে তার গুরুত্ব বোঝাতে পারলে সে নিজেকে অন্যের হাতের পুতুল ভাববে না। তার সঙ্গে কেউ অমানবিক আচরণ করতে চাইলে তার চেতনা স্বতঃস্ফূর্তভাবে জেগে ওঠবে। তার প্রতি অপরের অশোভনীয় আচরণকে তার সম্মানে আঘাত হিসেবে বিবেচনা করবে। কীভাবে একটা শিশুকে আত্মসম্মান, আত্মবিশ্বাস ও আত্মমূল্যায়ন শেখানো যায় তা সম্পর্কে ধারণা পেতে কোনো বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে পারেন অথবা অনলাইনে প্রতিবেদন পড়তে পারেন বা ভিডিও দেখতে পারেন।

নিউজটি শেয়ার করে আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর
© All rights reserved © 2019-2020 । দৈনিক আজকের সংবাদ
Design and Developed by DONET IT
SheraWeb.Com_2580