শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ০৬:২৭ অপরাহ্ন
শিরোনাম :

নীলরঙ  প্রজাপতি

নিউজ ডেক্স:
  • প্রকাশিত সময় : শনিবার, ১৫ জানুয়ারী, ২০২২
  • ৩৫২ পাঠক পড়েছে

নীলরঙ  প্রজাপতি
                                                  আমজাদ হোসেইন

শীতের রাত। চারদিক হালকা কুয়াশায় ছাওয়া । নিম নিম করে হাওয়া বইছে। রিক্সায় জড়সড়ো হয়ে বসেও শান্তি নেই । বিষ ঠান্ডা । দূরের মসজিদে কোথাও আজান শুরু হয়েছে । এশার আজান ।সাঁঝরাতেই রাস্তা-ঘাট প্রায় জনশূন্য । লোকজন নেই খুব একটা । বাতাসে ধূপের গন্ধ ভেসে আসছে। এই এলাকাতেই — কাছেপিঠে কোথাও হবে, কয়েক ঘর প্রাচীন নৃ-গোষ্ঠি বৌদ্ধদের বাস। অনেকদিন আগে তাদের পূর্বপুরুষের কিছুঅংশ ব্রম্মদেশের আরাকান রাজ্য থেকে মুসলিমদের তাড়া খেয়ে বঙ্গদেশে এসেছিল । যাযাবরের মতো ভাসতে ভাসতে একদিন তারা যশোরের কপোতাক্ষ নদের তীরে  এসে বসতি স্হাপন করে । কালক্রমে স্হানান্তরিত হয় এবং আজকের এই লাকায় বৌদ্ধমন্দির প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্হায়ী হয় । তখন থেকে লোকমুখে এলাকাটির নাম হয়ে যায় বার্মাপাড়া ।সান্ধ্যকালীন অর্চনার ধূপের গন্ধ এই মন্দিরেরই । আমি রিক্সাঅলাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমরা বার্মাপাড়া কি পার হয়েছি ? রিক্সাঅলা পেছনে ঘাড় ঘুরিয়ে উচ্চস্বরে জবাব দিল, আমি আসলে বাপ-মা মরা আপা । তারা এখন আর বেঁইচে নেই । লোকটা ঠসা । নিশ্চিত হলাম ।কাজেই ওর সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছেটা বাদ দিতে হলো ।

সে এবার আরো জোরে জোরে কথা বলা শুরু করলো । ঠসারা নিজেরা কানে কম শোনে অথবা শোনেইনা, অন্যদেরকেও তাই ভাবে ।সে বলছিল, আপা, আমার বাপ-মা দুইজনেরই বয়স একশ বছর পার হইয়ে গেছিলো । এ কতা বিশ্বেস করেনা কেউ । তয় আমি জানি আপনে ক’রবেন । আপনে মানবতা লোক । নইলে কি আর আপনে আমার মতোন একজন রিক্সাঅলার বাপ-মা’র কতা সোধেন ?

কোথায় যেন পড়েছিলাম, মফস্বল শহরের নাপিত আর রিক্সাঅলা একবার সুযোগ পেলে ওরা অনর্গল কথা কয় । থামেনা । তখন ওদের অর্গল খুলে যায় । আমি বললাম, তোমার নাম কি ? বাম কান খারাপ আপা । ডান কানেও কম শুনি । চেঁচিয়ে বললাম, নাম– তোমার নাম কি ? অ অ অ, আমার নাম বজু । ভাল নাম সেখ বজলু আপা । আমি মুখে তালা লাগিয়ে দিলাম । এর সাথে আর কথা বলা যাবেনা ।

বজু একা একাই কথা বলে যাচ্ছিলো, আপা, আমার বাপ-মা ছিলো একজুড়া মহব্বতের কৈতর । এখনকার দুনিয়ায় মাইনষ্যের মদ্যি এই মহব্বত আর দেকা যায়না । দুনিয়া এখন হয়ে গেছে বালখামছানির জায়গা । আমার মাথার মধ্যে ছিল অন্য চিন্তা । ভাল করে বুঝলাম না বজলুর কথা । কেন যেন চুপ থাকতে পারলাম না । তাই  হেসে উৎসাহ দিয়ে বললাম, তোমার বাবা-মা ছিল সুখি দম্পতি, তাইনা ?

সঙ্গে সঙ্গে এ কথার প্রতিবাদ এলো, আরে না না, আপা । আমার বাপ-মা’র কোন সয়-সম্পত্তিই ছিলনা । আমরা খুব গরীব । দুই ভাই-ই রিক্সাঅলা । গুঁড়্যাগাঁড়ার মুখে দু’বেলা ভাত তুইলে দেওয়াই আমাগের জন্যি কটিন । একটা শ্যাষ ঘটনার কতা কই শোনেন । বাজারে জম্মের আকাল, একা আর আমি সংসার চালাতি পারতিছিল্যাম না আপা । একদিন বিয়েন বেলা উঠোনে দাঁড়ায়ে আমি ছোড্’ডারে কইলেম, এতদিন তো আমি একলাই বাপ-মা’ক টইনলেম, এখন এক কাম কর রে ভাই, , ইবার তুই একজনেক লে, হয় বাপেক, লয় মা’ক । বজু একটু থামলো । দম নিয়ে আবার সে বললো, আপা, আমার মুখের কতা ফুরোলই না, মা উঠোনে নাইমে আইসে আমার হাত ধইরে কইলো, বজু, বাপ, চিন্তা কইরবানা । আমরা বুড়ো-বুড়ি আর বেশি দিন বাঁইচবোনা, ক’ডা দিন কষ্টো করো । মরার আগে তুমার বাপেক আর আমার কাছ থেইকে ভেনো কইরোনা । এইডা আমার শ্যাষ কতা । বজলু কাঁধের গামছা দিয়ে নাক মুছলো । রিক্সা স্লো হয়ে গেল । এবার সে ভেঙে পড়ে বললো, আপা, পরেদ্দিন কিরাম কি অয়ে গেল বুজতি পারলাম না, বিয়েন বেলা আমার মা মইরে গেল। আর বিকেল বেলা গেল বাপ । মানিকজোড় মরা । পিথীবির এক আচ্চয্য মিত্যু । বজলু গামছা দিয়ে এবার চোখ মুছে পিছন ফিরে অনুনয় করে বললো, আপা, তাগের জন্যি দুআ ক’রবেন।

আমার মনেহলো, বজলুর কথা এখানেই শেষ হয়ে গেল । এরপর আর কি কথা ! কিন্তু বজলুর কথা শেষ হলোনা । অর্গল খুলে গেছে ।
কিন্তু সেসব কথা আর আমার কান পর্যন্ত পৌঁছুলো না । বজলুর অনেক কথাই হয়ত সত্য নয় ; কিন্তু মূল কথটি হলো, দাম্পত্যে মহব্বত । মিল । একজন অশিক্ষিত লোকের মুখে তার বাপ-মা’র দাম্পত্য জীবনের এমন সুখের গল্প শুনতে আমার ভাল্লাগছিল না । কেবলই মনে হচ্ছিল, আমি এই রিক্সাঅলার চাইতেও অধম । আমার এ রকম কোন গল্প নেই । খারাপ লাগছিলো । বারবার ঘুরেফিরে নিজেকে প্রশ্ন করছিলাম : সুখি হওয়ার জন্যে আমার আম্মুর সংসারে কীসের এত অভাব ? কোন্ উপকরণের ঘাটতি রয়েছে সেখানে ? সংসারে এত অশান্তি কেন ? লোকচক্ষুর আড়ালে মাঝে মাঝে আমাদের সবাইকে চোখের জল লুকাতে হয় কেন ? শশী, শ্যামা, আব্বুর মনে কি প্রতিক্রিয়া হয় আমি জানিনা ; কিন্তু আমার মনে এরকম  হাজারো প্রশ্নের জন্ম হয় দিবারাত্রি । জবাব মেলেনা । আমি ঠিক জানিনা ; তবু মনেহয়, আসলে সুখের জন্যে জীবনে অল্পে তুষ্ট  থাকার একটা বিষয় আছে । আসলে অর্থ-সম্পদ প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির মধ্যে একটা সীমারেখা টানার প্রয়োজন আছে । আসলে ব্যক্তিগত জীবনে ক্ষমতা আর কর্তৃত্বের দাপট থেকে মুক্ত থাকার একটা বিষয়
আছে । আমাদের এসবের কোন বালাই নেই । আমাদের কিসের এত অহঙ্কার ?

আম্মুর সংসার । অর্থ । সম্পদ । শাসন । আর নিয়মের বেড়াজালে বন্দী । সেখানে আবেগের কোন মূল্য নেই । নানাজানের বংশানুক্রমিক প্রতাপ নিজের চরিত্রে এখনো ধারন করে আছেন আমার জননী ।ফুলের মতন দু’টি মেয়ে হারিয়ে ফেলেছেন তিনি ।আব্বুর মন জয় করতে পারেননি আজও । আমি সবেধন নীলমনি ; আমার ভবিষ্যৎ পদ্মপাতার জল । টলমল । প্রচন্ড মেধাবী দেখে একজন এতিম ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করে আমার নানাজান নিজের আত্নরম্ভি কনিষ্ঠ-কন্যার সাথে বিবাহ দিয়েছিলেন । সেদিন কিন্তু কারো কোন দ্বিমত করার সুযোগ ছিলনা । আমার ধারণা, সেইথেকে জগৎ-সংসারের প্রতি এক ধরনের বীতশ্রদ্ধভাব সবসময় আম্মুকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে । হয়তো নিজেদের রাজবাড়িতে আশ্রিত ছেলের সঙ্গে তার বিবাহ সেদিন আম্মু মনথেকে মেনে নিতে পারেনি । হয়তো আজো সে অনুতাপ বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি । আব্বুর জন্যে মাঝে মাঝে খারাপ লাগে আমার । খুব দুখী মানুষ । বুঝতে দেননা কাউকে। পাথর বুকে চাপা রেখে হাসি মুখে আম্মুর সব হুকুম তামিল করে যান । হয়ে গেছেন ছাল-বাকলাবিহীন টাকা-ফলের গাছ । ভিতরে রক্তক্ষরণ যে তার হয়না ; হয় । আমি টের পাই — যখন দেখি মাঝরাতে তিনি বারান্দার গ্রীল ধরে দাঁড়িয়ে আছেন । আকাশের দিকে বোবার মতো চেয়ে থেকে বাকি রাতটুকু একলা পার করে দেন ।

এই যে দীর্ঘদিন পর বাসায় ফিরছি, গিয়ে কি দেখবো আমি ? আমার জন্যে বাসায় কি সিচ্যুয়েশন অপেক্ষা করছে ? আমার বিয়ে নিয়ে জোড়াজুরী ? নাকি দেখতে হবে, গাড়িবারান্দার দুই মেরুতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা শুকনো দুইখন্ড কাঠ-মানুষের মুখ ? আমার কান্না পাচ্ছিলো । হঠাৎ দেখি, রিক্সাঅলা বজু পেছনে তাকিয়ে চেঁচিয়ে কথা বলছে, আপা, কতা কন’না ক্যা, এখন কুথায় যাতি অবে, কন’না ক্যা ? আরে, এ তুমি আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছো, থামো থামো । দেখলাম, বজলু ডিসি অফিস, ট্রেজারী অফিস আর এসপি অফিসের মাঝখানে তে-মাথায় দাঁড়িয়ে আছে । বললো, আপনে এসডিও কোটে যাইবেন না ? রাতেরবেলা আমি এসডিও কোর্টে কেন যাবো, এখানে তুমি এসডিও কোর্ট কোথায় পেলে ? তা’অলে এখন কুথায় যাবো ? আমি বিরক্তহয়ে চেঁচিয়ে বললাম, তুমি রিক্সা ঘোরাও । এসডিও কোয়ার্টার, এসডিও কোয়ার্টার, এসডিও কোয়ার্টারে  যাও — বজু ঠসা এবার কানে শুনলো । শক্তি দিয়ে সে দ্রুতগতিতে এসডিও কোর্টারের দিকে ছুটতে থাকলো ।

নিউজটি শেয়ার করে আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর
© All rights reserved © 2019-2020 । দৈনিক আজকের সংবাদ
Design and Developed by ThemesBazar.Com
SheraWeb.Com_2580