শুক্রবার, ২০ মে ২০২২, ১০:৩৯ পূর্বাহ্ন

সত্যঘটনা

নিউজ ডেক্স:
  • প্রকাশিত সময় : মঙ্গলবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০২১
  • ৫৫৭ পাঠক পড়েছে

সত্যঘটনা
যৌতুকের বলি

                                                                  মোঃ আবু বকর সিদ্দিক পিপিএম

কোলাহলহীন নিস্তব্ধ অন্ধকার রাত্রি। যান্ত্রিক শব্দের কোন বালাই নাই। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার্থে ঝিঁঝিঁ পোকার সুরেলা আওয়াজ, প্রহরে প্রহরে কিছু পাখির ডাক, মাঝেমধ্যে মেছি কুকুরের ঘেঁউ ঘেঁউ ছাড়া আর কিছু শোনা যায় না। স্পন্দনহীন প্রকৃতির ধ্যান ভঙ্গ করে হঠাৎ ক্ষুধার্থ শিশুর আবেগ মিশ্রিত কান্না। তার কান্নায় সহদোর ভাইবোন জেগে উঠে। অন্ধকার ঘরের মধ্যে মাকে না পেয়ে একত্রিত তিন জনের কান্নায় রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে অনেক দুর পর্যন্ত শোনা যায়। তাদের কান্না শুনে অনেক মাতৃদুগ্ধ্রদাত্রীর ঘুম ভেঙ্গে যায়। কিন্তু যার জন্য কান্না সে তো সাড়া দেয় না। পাশের ঘরে থাকা দাদা লালু মোল্লা, দাদী সুফিয়া বেগমের কর্ণ গহব্বরেও তাদের কান্নার আওয়াজ প্রবেশ করে না। তারা শব্দ বধির হয়ে ঘুমরাজের কাছে নিজেদের আত্নসর্মপন করেছে। একসময় ক্রন্দনের তীব্রতা বৃদ্ধিতে রক্তের টানে প্রকৃতির নিয়ম ভঙ্গ করে দাদা-দাদী ঘুম থেকে জেগে উঠে। টর্চলাইট হাতে ঘর থেকে বের হয়। এদিক ওদিক লাইট মেরে ছেলের ঘরে প্রবেশ করে। ঘরে আলো জ¦লে ছোট বাচ্চাকে দাদী কোলে নেয়। অন্য দুইজনকে থামানো গেলেও মাতৃদুগ্ধ পানে অভ্যস্থ শিশু দাদীর কোলে ক্ষুধা নিবারন না হওয়ায় কান্না থামেনা। লালু মোল্লা করুন সুরে ডাকে “বউমা ও বউমা, কই গেলা, ও শরিফের মা পোলাপানরে থুইয়া কই গেলা “ও ম্ঞ্জুুর মা দেহতো বাথরুমে গেছেনি ইত্যাদি বলে এদিক ওদিক লাইট মেরে প্রতিবেশিদের দৃষ্টি আকর্ষন করার চেষ্টা করছিল। লালু মোল্লার আপনজন ও প্রতিবেশী হালিম দুলালকে ডেকে উঠায়। তারাসহ বাড়ীর আশপাশে খোঁজাখুঁজি করে। লালু মোল্লা পাশের গ্রামে হালিম ও দুলালকে সাবিনার (ছদ্ম নাম) ভাইয়ের বাড়ী পাঠায়। সাবিনাকে না পেয়ে ফেরত আসে। প্রতিবেশী লোকজন বাড়ী ভরে যায়। সুফিয়া বেগম লোকজনের কাছে তাচ্ছিলের সুরে বলে “হেই বেডি দুধের পোলাপানরে ছাইরা কই গেছে কইতে পারি না, বাপের বাড়ী যায় নাই, আত্নীয় কুডুমগো বাড়ী যায় নাই, তয় কই গেছে আল্লা মাবুদ জানে” “টাহা-পয়সা, সোনা-দানা ব্যাকটি লইয়া নাগরের লগে গেছেগা।“লালু মোল্লা সরাসরি বলে বসে।

পরদিন সকালে লালু মোল্লা হালিম ও দুলালকে নিয়ে ফুলবাড়ীয়া থানায় সাবিনার বিরুদ্ধে জিডি করে। জিডিতে উল্লেখ করে যে, তার ছেলে মঞ্জুরুল দুই বৎসর হয় কাতারে গেছে, বউ সন্তান বাড়ী রেখে যায়। তাদের ভরণ পোষনে কোন ব্যতয় ঘটেনি। ছেলে বিদেশ থেকে বউয়ের নামে অনেক টাকা পাঠাইছে। সেখান থেকে কোন টাকাও নেয় না, সব টাকা বউ এর কাছে থাকে। গত রাতে খাওয়া দাওয়া করে সাবিনা তিন সন্তান নিয়ে নিজ ঘরে ঘুমাতে যায়। রাত্রি অনুমান ১২.০০ টার সময় বাচ্চাদের কান্নায় তাদের ঘুম ভেঙ্গে যায়। ঘরে গিয়ে দেখে বউ নেই। অনেক খোঁজাখুঁজি করে পায় নাই। তার বিশ্বাস পরকিয়ার টানে বউ কাউকে না বলে টাকা ও স্বর্নালংকার নিয়ে পালিয়ে গেছে। সাবিনার বিরুদ্ধে থানায় চুরির অভিযোগে জিডি হওয়ায় সন্তষ্ট চিত্তে বাড়ী ফিরে আসে।
পড়ন্ত বিকাল। আকাশে মেঘ। যে কোন সময় বৃষ্টি হতে পারে। অবেলার বৃষ্টিতে গরু ভিজে যাবে। লেবুর মা গরু আনার জন্য লালু মোল্লার বাড়ীর পার্শ্বে যায়। লালু মোল্লার জমিতে স্যালোমেশিনের গর্তে পানির মধ্যে একজন মহিলাকে উপুর হয়ে পড়ে থাকতে দেখে। লেবুর মা চিৎকার দিয়ে বলে তোমরা কে কোথায় আছো, দেইখা যাও কে পানিতে পইরা আছে। চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা জড়ো হয়। লালু ও তার স্ত্রী সুফিয়া বেগম আসে। গর্তের কাছে গিয়া সুফিয়া বেগম চিৎকার দিয়া মাটিতে বসে পরে। হায় হায় গো এইডা আমাগো বউয়ের কাপড় দেহা যাইতাছে। আমাগো বউ হইবো। কাল রাত থাইকা পাওয়া যাইতেছে না। কত খুঁজলাম। এবাড়ী ও বাড়ী, এপাড়া ও পাড়া, খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে গেলাম কোথাও পাইলাম না। আর কি না বাড়ীর কাছে ,,,,,,,,। পাড়ার সাহসী দুইজন যুবক পানি থেকে উঠায়। মরে হাত পা শক্ত হয়ে গেছে। অনেক সময় পানিতে থাকায় ফুলে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। মুখ থেকে বিষের গন্ধ বের হচ্ছিল। সুফিয়া বেগম বিলাপের ফাঁকে ফাঁকে দুই হাত দিয়ে বুকচাপড়ায় কখনো কপাল চাপড়ায়। তুই ক্যান আত্নহত্যা করলি। তোর কিয়ের অভাব? পোলাপানরে এতিম করলি। সুফিয়া বেগমের কান্নায় আকাশ বাতাস ভাড়ী হয়ে উঠে। পরিবেশ থমথমে ভাব হতে হতে প্রকৃতি নিজেকে ধরে রাখতে পারেনা। আকাশের মেঘ কান্না হয়ে ধরণিতে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝড়তে লগলো। সুফিয়া বেগম বউরে থুইয়া যাইবো না। বৃষ্টির মধ্য লুটিপুটি খাচ্ছে। প্রতিবেশি মেয়েরা জোরকরে টেনে বাড়ী নিয়া যায়। এদিকে লালু মোল্লাও বসে নাই। ছোট নাতিরে কোলে নিয়া এক পাশে কাঁদছিল। বৃষ্টি থেমে যায়। পুলিশ আসে। সকলেই আবার লাশের কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। পুলিশ লাশের সুরতহাল রিপোর্ট তৈরী করে। পানিতে পরা ও মুখে বিষের গন্ধ সন্দেহ হওয়ায় ময়না তদন্তের জন্য লাশ নিয়ে যায়। ময়না তদন্ত শেষে মৃতের সৎকারের সাথে সাথে সাবিনার মৃত্যুর বিষয়টি চাপা পরে যায়।

সাধারনতঃ ইউডি মামলার ব্যাপারে থানা পুলিশের তেমন আগ্রহ থাকেনা। হাজারো কাজের মাঝে অজগ্রামের পরিচয়হীন সাবিনার মৃত্যুর ব্যাপার থানা পুলিশের স্মরণ থাকার কথা না। ৪/৫ মাস পরের কথা। হঠাৎ ময়না তদন্ত রিপোর্ট প্রাপ্তিতে থানা পুলিশ নড়েচড়ে বসে। ময়না তদন্ত রিপোর্টে ডাক্তার সাহেব মতামত প্রদান করে যে, ঈড়হংরফবৎরহম ঃযব ধঁঃড়ঢ়ংু ভরহফরহমং ধহফ ঈযবসরপধষ বীধসরহবৎদং ৎবঢ়ড়ৎঃ, ফবধঃয রহ সু ড়ঢ়রহরড়হ ধিং ফঁব ঃড় ধংঢ়যুীরধ ৎবংঁষঃবফ ভড়ৎস ঃযৎড়ঃঃষরহম যিরপয ধিং ধহঃবসড়ৎঃবস ধহফ যড়সরপরফধষ রহ হধঃঁৎব. যার মুল কথা সাবিনাকে গলা টিপে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ নিজে বাদী হয়ে সন্দিগ্ধ হিসাবে ১। মোঃ লালু মোল্লা, ২। মোঃ মুঞ্জুরুল হক, ৩। সুফিয়া বেগম, ৪। মোঃ দুলাল মিয়া, ৫। আঃ হালিম, ৬। মোঃ আলম মিয়া ও অজ্ঞাত ৩/৪ জনকে আসামী করে থানায় মামলা করে।

তথ্য উৎঘাটনে তদন্তকারী অফিসারকে বিভিন্ন কৌশল অবলন্বন করতে হয়। অপরাধ ও অপরাধীর তথ্য সংগ্রহ করার প্রয়োজনে সোর্স নিয়োগ করা হয়। কাকে সোর্স নিয়োগ করা হবে তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দক্ষতা ও কৌশলের ওপর। প্রকৃত সোর্স নিয়োগকারী কর্মকর্তা ব্যতিত আর কারো গোচরী ভূত হওয়ার কথা নয়। কিছু অদক্ষ কর্মকর্তা গতানুগতিক নামধারী বা পেশাধারী সোর্সের উপর এত বেশী নির্ভরশীল হয়ে পড়ে যে, তাদের কথা মত কাজ করায় নিরীহ জনগন ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ফলে পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়। আবার অনেক সময় সোর্সকে জীবন দিতে হয়।

থানা পুলিশ হত্যার কোন সুরাহা করতে না পারায় পিবিআই, ময়মনসিংহ তদন্তভার গ্রহন করে। পিবিআই, তদন্তকালে নিজস্ব কৌশল অবলন্বন করে জানতে পারে, ১৬ বৎসর পূর্ব পাশের হাতিলেট গ্রামে মুঞ্জুর সাথে সাবিনার বিয়ে হয়। গরীব বাবা মা, মেয়ের বিয়েতে সম্মান জনক যৌতুক দিতে পারে নাই। যৌতুকের জন্য সাবিনাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন অবলিলায় মেনে নিতে হতো। দুই সন্তান জন্ম হবার পরও নির্যাতনের মাত্রা বাড়ে বৈ কমে না। যার ফলে বিয়ের অনেক পরে অমানুষিক নির্যাতনের স্বীকার হওয়ায় ভাই মান্নান নিজে বাদী হয়ে আদালতে যৌতুকের মামলা করে। মামলায় আসামীদের সাজা হবে আশংকায় বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে মামলা তুলে নিতে বাধ্য করে। এই মামলা চালাতে লালু মোল্লার অনেক টাকা খরচ হয়। লালু মোল্লা এই ক্ষোভ অন্তরের অন্তঃস্থলে অতিযত্নে লালন করছিল। সাবিনার মৃত্যুর ২ বৎসর আগে স্বামী চাকরীর জন্য কাতার যায়। কাতার যাবার সময় টাকার জন্য সাবিনাকে চাপ দেয়। গরীব ভাই তাই টাকা দিতে পারে না। স্বামী চলে গেলে শশুর-শাশুড়ীর সংসারে ৬ মাসের সন্তান সম্ভবনা অবস্থায় সংসারের যাবতীয় কাজ করেও মৌখিক গঞ্জনার হাত থেকে রেহাই পেত না। স্বামী বিদেশ থেকে বাবার নামে টাকা পাঠাতো। সাবিনাকে সামান্য খরচের জন্য কোন টাকা দিতনা। শত কষ্টের মাঝেও স্বামীর সংসার আঁকড়ে ধরে থাকে। তৃতীয় পুত্র-সন্তান জন্ম নেয়। শ^শুর-শাশুড়ির অত্যাচার কমে না। বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত করতে থাকে। এককথায় সাবিনাকে বাড়ী থেকে তাড়াতে পারলে বাঁচে। সাবিনার ভাই মামলা করায় মামলার পিছনে অনেক টাকা ব্যয় হয়। সেই ক্ষোভ সাবিনার উপর ঝাড়তে থাকে। সাবিনার সন্তান লালন পালনে তাদের কোন ভূমিকা ছিল না। বাচ্চাদের অসুখে-বিসুখে লালু মোল্লা তার পুত্রবধু সাবিনা আক্তারকে কোন রকম সহযোগীতা করত না। মুঞ্জুরুল বিদেশ হতে লালুর নামে টাকা পাঠাতেন। সেই টাকার কোন অংশ সাবিনাকে দিত না। সাবিনা সহ তার সন্তানদের জন্য ঠিকমত বাজার করতো না। টাকাসহ পারিবারিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সাবিনা আক্তারের সাথে শ^শুর শাশুড়ির বিরোধ প্রায়ই লেগে থাকতো। লালু মোল্লার সকল কাজে প্রতিবেশী ভাতিজা দুলাল ও হালিম সহযোগীতা করতো।

পিবিআই ময়মনসিংহ, লালু মোল্লা ও আব্দুল হালিমকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা স্বেচ্ছায় স্বীকার করে যে, ঘটনার কয়েকদিন আগে সাবিনা আক্তারকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। হালিম ও দুলালকে টাকার বিনিময়ে সম্পৃক্ত করে। ঘটনার দিন ১৩/০৯/১৭ খ্রিঃ তারিখে রাতের খাবার খেয়ে সাবিনা তিন সন্তানকে নিয়ে নিজ ঘরে ঘুমিয়ে পরে। কে জানতো এটাই সাবিনার শেষ ঘুম। রাত অনুমান ০৯.৩০ ঘটিকায় লালু মোল্লা ও তার সহযোগী হালিম ও দুলাল মিলে সাবিনার ঘরে ঢুকে। সুফিয়া বেগম দরজার বাহিরে দাড়িয়ে প্রহরীর কাজ করে। ঘুমন্ত সাবিনাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে। পাশেই তিনটি ঘুমন্ত অবুঝ শিশু জানতে পারলোনা দাদা-দাদী তাদের মাকে হত্যা করলো। হত্যার পর সাবিনার নিথর দেহ ঘরের বাহিরে আনলে আপন শাশুড়ী মুখে বিষ ঢেলে দেয়। নিষ্পাপ অবুঝ শিশুদের মা কে হত্যার সময় পাষাণ হৃদয় এতটুকু গলেনি। তাদের পাপিষ্ঠ হাত আড়ষ্ট হয়নি। মৃতদেহ বাড়ীর পাশে স্যালমেশিনের পানি ভর্তি গর্তে ফেলে দেয়। তারপর হালিম ও দুলাল নিজ নিজ বাড়ী যায় এবং স্বামী-স্ত্রী নিজ ঘরে গিয়ে অপেক্ষায় থাকে। পরবর্তী দৃশ্যে নিপুণ অভিনয় করে ঘটনার যবনিকা টানে। হত্যাকারীদের ধারনা রাতের আধারে কেউ দেখেনি। তারা জানেনা সদাজাগ্রত সৃষ্টিকর্তার চোখ কেউ ফাঁকি দিতে পারে না। যৌতুকের জন্য যে কলঙ্কের পোষাক পরিধান করলো শেষ বিচারের দিন পর্যন্ত তারা সেই পোষাকে থাকবে। লেখকঃ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অবঃ)

নিউজটি শেয়ার করে আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর
© All rights reserved © 2019-2020 । দৈনিক আজকের সংবাদ
Design and Developed by ThemesBazar.Com
SheraWeb.Com_2580