সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ০৯:৩৯ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
টাংগাইল বন বিভাগের দোখলা সদর বন বীটে সুফল প্রকল্পে হরিলুট আগ্রাবাদ ফরেস্ট কলোনী বালিকা বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হলেন মোজাম্মেল হক শাহ চৌধুরী ফৌজদারহাট বিট কাম চেক স্টেশন এর নির্মানাধীন অফিসের চলমান কাজ পরিদর্শন নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করায় দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগ ২০৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবে: শেখ সেলিম সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের করমজল ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র চলছে সীমাহীন অনিয়ম এলজিইডির কুমিল্লা জেলা প্রকল্পের পিডি শরীফ হোসেনের অনিয়ম যুবলীগে পদ পেতে উপঢৌকন দিতে হবে না: পরশ নির্বাচন যুদ্ধক্ষেত্র নয়, পেশি শক্তির মানসিকতা পরিহার করতে হবে: সিইসি যুদ্ধ না, আমরা শান্তি চাই : প্রধানমন্ত্রী

সত্য ঘটনা, প্রেমের জ্বলন্ত ইতিহাস

নিউজ ডেক্স:
  • প্রকাশিত সময় : শনিবার, ১৫ জানুয়ারী, ২০২২
  • ৫৭৮ পাঠক পড়েছে

সত্য ঘটনা
প্রেমের জ্বলন্ত ইতিহাস
                                                              মো. আবু বকর সিদ্দিক

রাতের চতুর্থ প্রহর। নীরব নিস্তব্ধ পরিবেশ। নির্মল বাতাস। কিছু মানুষ নিজ নিজ ধর্মীয় মতে আত্মশুদ্ধির নীরব ধ্যানে মগ্ন। একটি শিশু মা মা বলে আবেগময়ী কান্নায় প্রকৃতির ধ্যান ভঙ্গ করে। পাশের ঘরে ঘুমন্ত নানা-নানির আচমকা ঘুম ভেঙে যায়। নানি কমলা দাস দ্রত ঘর থেকে বের হয়ে মেয়ে রমা রানীর ঘরের সামনে আসে। দেখে দরজা বন্ধ। রমা, রমা বলে বারবার ডাকা সত্তে¡ও কোনো সাড়া পায় না। একপর্যায়ে ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে যায়। অন্ধকার ঘরের ভেতরে তিমি একা বিছানায় বসে কেঁদেই যাচ্ছে। তিমির বয়স আড়াই বছর। নাদুসনুদুস চেহারা। মেয়েকে না পেয়ে কমলা রানী দাশ ভয় পেয়ে যায়। চিৎকার করে স্বামীকে ডাকে। ‘ও রমার বাবা, তাড়াতাড়ি আইসো, রমা ঘরে নাই।’ হন্তদন্ত হয়ে রমার বাবা বিমল দাশ ঘর থেকে বের হয়ে আসে। ওদিকে রমার দাদা-বৌদিও বসে থাকে না। রমা ঘরে নেই। সবাই চিন্তিত। কোথায় যেতে পারে। রমার দাদা টর্চ হাতে বাগান, পুকুর, বাঁশঝাড় ও আশপাশের এলাকা তন্ন তন্ন করে খোঁজে। এখনো ভোর হয়নি। বাঁশঝাড়ে ছোট ছোট পাখি কিচিরমিচির শব্দ শুরু করেছে। হয়তো অল্প সময়েই পৃথিবীকে রাঙিয়ে সূর্যের দেখা মিলবে। নতুন দিনের সূচনা হবে। সবার প্রত্যাশা নতুন দিন মঙ্গলময় হয়ে উঠুক। রমা রানীর দাদা একা ফেরত আসায় সবার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। বাকরুদ্ধ হয়ে একে অপরের দিকে তাকায়। পূর্বাকাশে রক্তিম সূর্যের আভায় পৃথিবী রঙিন হয়ে উঠেছে। কমলা রানী ও বিমল দাশের চোখে সূর্যের রক্তিম রং ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। পৃথিবীর সব রং বিবর্ণ হয়ে গেছে। আঁধার তাদের গ্রাস করছে। হায় ভগবান, একি হলো! কমলা রানী অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। সবাই ধরাধরি করে মাথায় পানি দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফুলবাড়িয়া থানাধীন আছিম গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ সব ধর্মের ছেলেমেয়ে একসঙ্গে লেখাপড়া করে। এই বয়সের ছেলেমেয়েদের মধ্যে লিঙ্গ ভেদাভেদ নেই। একসঙ্গে গোল্লাছুট, কানামাছি ভোঁ ভোঁ, মোরগ লড়াই ইত্যাদি খেলে। খেলার ছলে রমা ও দুলালের অবুঝ মনে একটু একটু ভালো লাগা শুরু হয়। প্রাইমারি পাস করে হাইস্কুলে ওঠে। আছিম হাইস্কুলে ভর্তি হয়। একসঙ্গে স্কুলে আসা-যাওয়া ও পড়াশোনার ফাঁকে ভালো লাগা কখন যে ভালো বাসায় পরিণত হয়, তা কেউ জানে না। নবম শ্রেণিতে ওঠার পর উভয়ের ভালোবাসা অন্যের দৃষ্টিগোচর হতে থাকে। একসময় কথাটা রমার বাবা মায়ের কানে পৌঁছায়। প্রথমে পারিবারিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করে কোনো লাভ হয় না। পরে রমা রানীর বাবা স্কুলের হেডমাস্টারের কাছে বিচার দেয়। হেডমাস্টারসহ শিক্ষকমন্ডলী উভয়কে বোঝানোর চেষ্টা করে। এমনকি দুলালকে একাধিকবার বেত্রাঘাতও করা হয়। স্কুল থেকে বের করে দেওয়ার ভয় দেখায়। সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়। যত বাধা আসে তাদের প্রেম তত মজবুত হতে থাকে। তাদের প্রেমের খবর এলাকায় ছড়িয়ে পরে। হিন্দু-মুসলিম সমাজপতিদের টনক নড়ে। বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ভবিষ্যতে এই বিষয় নিয়ে উভয় ধর্মাবলম্বীদের মাঝে বিরোধ বাধার আশঙ্কা আছে। দুলালের পরিবারের ওপর সামাজিকভাবে চাপ প্রয়োগ করা হয়। অনেক বোঝানোর পরও দুলালকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে না।পরিবারের লোকজন দুলালকে এলাকার বাইরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। গরিব পরিবারের সন্তান। অন্য স্থানে রেখে পড়াশোনা করানোর মতো সামথ্য তাদের নেই। অবশেষে ঢাকায় আত্মীয়ের কাছে পাঠিয়ে দেয়। বাবার আর্থিক কারণেই দুলাল লেখাপড়ার পরিবর্তে ঢাকায় রাজমিস্ত্রির জোগালি হিসেবে জীবন শুরু করে। প্রেমের কারণে লেখাপড়া ছেড়ে এখন শ্রমিক। সময় বয়ে যায়। একসময় রিকশা-ভ্যান চালাতে শুরু করে। পারিবারিক চাপে দুলাল বিয়ে করতে বাধ্য হয়। বউ নিয়ে ঢাকাতেই বসবাস শুরু করে। ইতিমধ্যে দুলাল দুই সন্তানের জনক হয়। এভাবে রমা রানী ও দুলালের জীবন থেকে অনেক বছর ঝড়ে যায়। দুলালের বাবা মারা গেছে। দুলাল পরিবার নিয়ে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি এসে রিকশাভ্যান চালানো শুরু করে। সে এখন স্থায়ীভাবে গ্রামে বসবাস করছে। এসএসসি পাস করার পর রমা রানীর লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। রমা রানী মনে মনে বিবাহ মেনে নিতে না পারলেও প্রকাশ করার ক্ষমতা ছিল না। স্বামীর ঘর করতে বাধ্য হয়। স্বামী একজন ব্যবসায়ী। ইতিমধ্যে রমা রানীর সঙ্গে দুলালের সম্পর্কের কথা অন্যভাবে শুনলেও তেমন একটা গুরুত্ব দেয়নি। ব্যবসায়ী মানুষ। অন্যদিকে মনোনিবেশ করার মতো সময় তার নেই। প্রথম অবস্থায় শ্বশুরবাড়ি দু-চার দিন থাকলেও এখন আর থাকে না। প্রয়োজন হলে দিনে এসে দিনে চলে যায়। রমা রানী নিজেও অনেক দিন পরপর বাবার বাড়ি আসে। এরই মধ্যে তাদের মাঝে ফুটফুটে কন্যাসন্তানের আগমন ঘটে। রমা রানীর সুখের সংসার। দুলাল ও রমা রানীর সম্পর্কের কথা সবাই ভুলে গেছে। কিন্তু রমা রানীর ভালোবাসার মানুষের অভাব কোনো কিছুতেই পূরণ হয়নি। হাজারো সুখের মাঝেও অপূর্ণতা রয়ে যায়। ২০১৮ সালের জুলাই মাস। রমা রানী মেয়ে তিমিকে নিয়ে ১৫ দিন যাবৎ বাবার বাড়ি আছে। সারা দিন প্রচন্ড গরম। রমা রানীর বুকের ভেতরে প্রবল বেগে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। উথালপাতাল ঢেউ আছড়ে পড়ছে। দিশেহারা মাঝির মতো সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। এত কিছুর মাঝেও সাংসারিক কাজে মাকে সহযোগিতা করে। নিজেই রাতে রান্না করে। মেয়েকে অনেক আদর যত্ন করে রাতের খাবার খাওয়ায়। কিন্তু নিজে খেতে পারে না। ভালো লাগছে না বলে মেয়েকে নিয়ে নিজ ঘরে যায়। সৃষ্টির শুরু থেকে মা-সন্তানের বন্ধন চিরন্তন, শাশ্বত। সন্তানের জন্মের সঙ্গে সঙ্গে এই বন্ধন তৈরি হয়। সেই বন্ধন ছিন্ন করতে হবে চিন্তায় সারা রাত রমার ঘুম হয় না। এত সুন্দর প্রতিমার মতো শিশু কন্যাকে ছেড়ে কোনো পাষন্ড মানুষও যেতে পারে না। কিন্তু রমা রানী! প্রেম মানে না কোনো বাধা। প্রেমকে যত চাপা দেওয়া হোক না কেন, প্রেমের অগ্যুৎপাত ঘটবেই। ভালোবাসার জন্য ধর্ম, বর্ণ ও গোত্র ত্যাগে কোনো ন্যায়-অন্যায় বোধ থাকে না। প্রেম অন্ধ। সুতরাং প্রেমিকের হাত ধরে অজানার পথে রওনা দিতে কোনো বাধা নেই। শত চেষ্টা করেও ঘটনা আর গোপন থাকে না। রমার পরিবার লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে থানা-পুলিশের শরণাপন্ন হয়। থানা-পুলিশ উদ্ধারের চেষ্টা করে। মামলা হয়। রমা রানী উদ্ধার না হওয়ায় মামলার তদন্ত পিবি আইয়ের ওপর অর্পিত হয়। পিবি আই তদন্তকালে কল ট্রেকিংয়ের মাধ্যমে সিরাজগঞ্জে দুলালের ভাড়া বাসা থেকে রমা রানীকে উদ্ধার করে। দুলাল বাসায় ছিল না। রমা রানীকে সিরাজগঞ্জ থেকে ময়মনসিংহ নিয়ে আসার সময় এক লঙ্কাকান্ড ঘটে যায়। সে কিছুতেই ময়মনসিংহ যাবে না। সে কেন ময়মনসিংহ যাবে, এখানে স্বামীর সংসারে ভালো আছে। সে একজন মুসলিম, সাবালিকা। হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। অনেক দিন যাবৎ দুলালের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তার বাবা-মা তাকে জোর করে দিলীপের সঙ্গে বিবাহ দিয়েছিল। সে স্বেচ্ছায় দুলালের সঙ্গে পালিয়ে যায়। ইসলামিক বিধান অনুযায়ী দুলালকে বিবাহ করেছে ইত্যাদি। অনেক বুঝিয়ে তাকে ময়মনসিংহ আনা হয়। রমা রানী বিজ্ঞ আদালতে একই জবানবন্দী দেয়। ফলে বিজ্ঞ আদালত ভিকটিম রমা রানীকে নিজ জিম্মায় ছেড়ে দেন। রমা রানী স্বামী দুলালের উদ্দেশে ময়মনসিংহ ত্যাগ করে। লেখক:পিপিএম অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অব.)।

নিউজটি শেয়ার করে আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর
© All rights reserved © 2019-2020 । দৈনিক আজকের সংবাদ
Design and Developed by ThemesBazar.Com
SheraWeb.Com_2580